শিরোনাম
◈ এবার বিবাহ নিবন্ধন নিয়ে সরকারের বড় যে ঘোষণা ◈ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সীমান্তে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন খতিয়ে দেখতে বিশেষ কমিটি গঠন ভারতের ◈ পদত্যাগ করলেন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন ◈ ভারতে প্রবেশ না করেই দেশে ফেরা নিয়ে মুখ খুললেন ড. জাহেদ উর রহমান (ভিডিও) ◈ রাজধানীর মহাখালী-তেজগাঁও সড়কে গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবরোধ ◈ এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে গায়েব! ওসির নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয় বহনকারীকে! ◈ নিউজিল‌্যা‌ন্ডের বিরু‌দ্ধে দু'বার পি‌ছি‌য়ে প‌ড়ে সান্ত্বনার ড্র নি‌য়ে মাঠ ছাড়‌লো ইরান ◈ আ‌র্জেন্টিনা‌কে হতাশায় ফেল‌তে পা‌রে আলজেরিয়ার ৪ তারকা ফুটবলার ◈ আকাশে আগুনের গোলা, উড্ডয়নের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে বি-৫২ বোমারু বিমান যেভাবে বিধ্বস্ত হয়, নিহত ৮ ◈ নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে মদ নিয়ে বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে দর্শক! ‘নিনজা টেকনিকে’ অবাক দুনিয়া

প্রকাশিত : ০৪ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:৪০ রাত
আপডেট : ১৩ জুন, ২০২৬, ০৭:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলার আকাশে দেখা গেলো মার্কিন শকুন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছোট কালী পেঁচার (Jungle Owlet) সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন দুই তরুণ বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী। একজন তানভীর তাসনিম অভি, অন্যজন গাজী আল মাহমুদ মারুফ। অভি বয়সে কিছুটা ছোট হলেও একদিক দিয়ে মারুফের চাইতে এগিয়ে। একমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রাপ্ত দুর্লভ কালী পেঁচার ছবি আছে অভির সংগ্রহে; কিন্তু গাজী মারুফ আজও তাকে ক্যামেরাবন্দী করতে পারেনি। তাই অভির সহযোগিতায় পাখিটির ছবি তুলতে তিনি ঢাকা থেকে ছুটে এসেছেন রাজশাহীতে।

ছোট কালী পেঁচা অতি বিরল পাখি। শুধু দেখতে পাওয়া যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আনিসুজ্জামান মো. সালে রেজার নজরে আসে ছোট কালী পেঁচা। দেশের পাখি তালিকায় সংযোজিত হয় নতুন একটি নাম। আর সেই থেকে আজও পর্যন্ত পাখিটির ছবি তুলতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বন্য প্রাণী আলোকিত্রীরা ছুটে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।

সময়টা ১০ নভেম্বর ২০২৪, অভির সহযোগিতায় কালী পেঁচার ছবি তুলতে গাজী মারুফকে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। আর এতে করে তখন ওরা দুজনেই বেজায় খুশি। আর তখন হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল বদ্ধভ'মি এলাকার দিকে। সেখানে বেশ কিছু পাখি যেমন বামুনি শালিক, মৌটুসি, মাছরাঙা এবং কুড়া ইগলের ছবি ক্যামেরাবন্দী করল ওরা। তারা যখন এসব পাখির ছবি তুলছিল, তখন আকাশে উড়ছিল কিছু শিকারি পাখি। পাখিগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য অভি খুব মনোযোগ দিয়ে আকাশের দিকে ক্যামেরার টেলিল্যান্স তাক করে রাখল, সেই সঙ্গে চোখ রাখল ভিউ ফাইন্ডারে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে এসে দুটি মধু বাজ এবং একটি শকুনের ছবি ক্যামেরাবন্দী করে ফেলল।

অভি ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি শুরু করেছে খুব বেশি দিন হয়নি। তবে ইতিমধ্যে সে শতাধিক পাখির ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছে। সর্বশেষ এইমাত্র ১৫০তম পাখির ছবি তুলল সে। সেটি একটি উড়ন্ত শকুন। ভীষণ আনন্দে ভরে গেল তার মন। কারণ, বাংলা শকুন (White-rumped vulture) এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না। বলতে গেলে এটা এখন এক দুর্লভ পাখি। আর রাজ শকুন (Red-headed vulture), সে তো বিলুপ্তই হয়ে গেল বাংলাদেশের বুক থেকে। হিমালয়ান গৃধিনী শীতকালে পরিযায়ী পাখি হিসেবে আমাদের দেশে আসে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার পর খাদ্যসংকটে দুর্বল হয়ে প্রায়ই মানুষের হাতে ধরা পড়ে। তবে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সিলেট ও সুন্দরবনে এখনো কিছু বাংলা শকুন টিকে আছে।

অভির সঙ্গি আলোকচিত্রীও এসে উড়ন্ত শকুনের কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দী করলেন। ছবি তোলা শেষ করে দুজনেই ভালোমতো উড়ন্ত পাখিটিকে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলেন এর ওড়ার ধরন এবং গায়ের রং দেশীয় শকুন কিংবা হিমালয়ান গৃধিনী থেকে আলাদা। পরবর্তী সময়ে অভি তার তোলা শকুনের আলোকচিত্রটি কয়েকটি পাখিবিষয়ক অনলাইন গ্রুপে পোস্ট করেন। সেখানে অনেকেই এ বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত মতামত ব্যক্ত করেন, এটি আমেরিকান কালো শকুন (American black vulture)। শুধু বাংলাদেশের আকাশ নয়, সমস্ত এশিয়ার আকাশেও এদের উপস্থিতি প্রায় অসম্ভব। তাহলে কি করে রাজশাহীর আকাশে এল আমেরিকার কালো শকুন?

অভি আমাকে সেই কালো শকুনের একটি ছবি পাঠিয়েছিল। খুব ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পেরেছিলাম, এটা আসলেই আমেরিকান ব্ল্যাক ভালচার। এই পাখিদের উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত রয়েছে এদের অবাধ বিচরণ। এদের পালকহীন ধূসর মাথা ও গলার সাথে শরীরের চকচকে কালো পালক বেশ মানানসই, যা সহজেই মানুষের নজর কেড়ে নেয়। অন্যান্য শকুনের মতো এরাও মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে। এই বিশাল আকারের পাখিগুলোর ডানার বিস্তার প্রায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। এরা সামাজিক পাখি, দলবদ্ধভাবে থাকতে ভালোবাসে।

রাজশাহীর আকাশে আমেরিকান কালো শকুন দেখা যাওয়ার বিষয়ে আমার কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মনিরুল হাসান খানের সঙ্গে। তিনি ঘটনার বিবরণ শুনে বলেন, 'এটা তো নর্থ আমেরিকার পাখি, একে তো দেশের আকাশে দেখা যাওয়ার কথা নয়।' তবে তিনি এ সম্পর্কে আরও বলেন, 'এ ধরনের ঘটনায় একেবারে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতিতে মাঝেমধ্যেই এ ধরনের বিষয় লক্ষ করা যায়। এ জন্য মূলত দায়ী বন্য প্রাণী চোরাকারবারিরা। সারা বিশ্বজুড়ে রয়েছে এদের শক্ত নেটওয়ার্ক। একেক সময় একেক রুট দিয়ে তারা বন্য প্রাণী পাচার করে থাকে। কখনো কখনো এদের চালান পড়ে বন বিভাগ কিংবা পুলিশের হাতে। পরবর্তী সময়ে ধৃত জন্তু কিংবা পাখিগুলোকে বিভিন্ন অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হয়। অভির ক্যামেরায় বন্দী হওয়া আমেরিকান কালো শকুনটির জীবনে সম্ভবত এ ধরনের ঘটনাই ঘটেছে। হয়তো ভারত কিংবা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে চোরাকারবারিদের কাছ থেকে আটক হওয়া আমেরিকান কালো শকুনটিকে পরে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল।'

মনিরুল খানের কথায় যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে এবং আমিও মনে করি, ঘটনা ঠিক তা-ই। এ ধরনের একটি ঘটনা আমার নিজের জীবনেও ঘটেছিল। বাংলাদেশে বালু বোরা (common Sand Boa) সাপের প্রথম জীবন্ত নমুনাটি আমি সংগ্রহ করেছিলাম নরসিংদীর চরসিন্দুর থেকে, সময়টা ছিল ৩ ডিসেম্বর ২০০২। ঘটনাটা নিয়ে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। কারণ, নরসিংদী বালু বোরার বসবাসের উপযোগী জায়গা নয়। তবে দীর্ঘ সময়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, যে জায়গা থেকে সাপটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে প্রতিবছর বেদের বহর আসত। তাদেরই কারও কাছে ছিল দুর্লভ সাপটি এবং একসময় তা পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল চরসিন্দুরের এক বটগাছের শেকড়ের ফাঁকে।

তাই বলা যায়, প্রকৃতিতে মাঝেমধ্যেই বেশ রহস্যময় সব ঘটনা ঘটে যায়, কিন্তু একটু ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করলেই আসল তথ্য বেরিয়ে আসে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়