শিরোনাম
◈ ধৃষ্টতা সকল সীমা ছাড়িয়েছ’; অভিনেত্রী শাওনকে নিয়ে তাজুল ইসলামের ক্ষোভ ◈ উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন, ভালো চাকরির ফাঁদে বিদেশে গিয়ে সাইবার স্ক্যামে বাধ্য, দেশে ফিরলেন ৩৭ বাংলাদেশি ◈ জুনের প্রথম ১০ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১২০ কোটি ৩১ লাখ মার্কিন ডলার ◈ দক্ষিণ আফ্রিকায় ঢুকতে গিয়ে বিপাকে ৯ বাংলাদেশি, মিলল ভুয়া পাসপোর্ট-ভিসার প্রমাণ ◈ বিশ্বকাপে দ‌ক্ষিণ কো‌রিয়ার দারুণ সূচনা ◈ আদ্-দ্বীনের হাসপাতাল নয়, বাতিল হয়েছে প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স: দাবি আইনজীবী শিশির মনিরের ◈ স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস ও হামে শিশুমৃত্যুর জন্য ড. ইউনূসের বিচার চাইলেন শেখ হাসিনা ◈ ‌বিশ্বকা‌পে ব্রাজিল বনাম মর‌ক্কো ম্যাচের রেফা‌রি দেহব্যবসায় জড়িত মামলার আসা‌মি স্লাভকো ভিনচিচ ◈ আ‌মে‌রিকার বিরু‌দ্ধে যুদ্ধ ব‌ন্ধে ইরান এখন পর্যন্ত চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়‌নি ◈ ফুটবল বিশ্বকাপের মধ্যেই আজ থে‌কে শুরু হ‌চ্ছে আরো এক বিশ্বকাপ

প্রকাশিত : ১৮ মে, ২০২৬, ০৭:২৬ সকাল
আপডেট : ০৬ জুন, ২০২৬, ১১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইরানের নতুন বাণিজ্য 'হাবে' পরিণত হচ্ছে পাকিস্তান

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞার কারণে করাচি বন্দরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আটকে আছে ইরানগামী প্রায় ৩ হাজার কনটেইনার। এই জটিলতা কাটাতে এবং বাণিজ্য সচল রাখতে ইরানের জন্য ছয়টি স্থল করিডোর বা সড়কপথ উন্মুক্ত করেছে পাকিস্তান। জরুরি লজিস্টিক পদক্ষেপ হিসেবে এটি শুরু হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদের কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে পারে এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে তেহরানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে ২০০৮ সালের একটি নিষ্ক্রিয় দ্বিপাক্ষিক সড়ক পরিবহন চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করে গত ২৫ এপ্রিল পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি নির্দেশ জারি করে। এর মাধ্যমে করাচি, কাসিম ও গদাদর বন্দরকে ইরানের সীমান্তবর্তী গাবদ ও তাফতান অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

বেলুচিস্তানের তুর্বত, পাঞ্জগুর, খুজদার, কোয়েটা এবং ডালবান্দিনের ওপর দিয়ে যাওয়া এই রুটগুলো একটি ট্রানজিট কার্গো নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। সামুদ্রিক বাণিজ্য অবরুদ্ধ হওয়ার এই সময়ে ইরানের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক স্বস্তির পথ। যদিও স্থলপথের পরিবহন সমুদ্রপথের চেয়ে ধীরগতির এবং ব্যয়বহুল, তবু খাদ্যশস্য, ভোগ্যপণ্য ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির জন্য সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ইরানের কাছে এটি এখন বড় এক লাইফলাইন।

এই কাঠামোর আওতায় তৃতীয় কোনও দেশের পণ্যও পাকিস্তান হয়ে ইরানে প্রবেশ করতে পারবে, ইসলামাবাদের নিষেধাজ্ঞা থাকায় কেবল ভারতের পণ্য ছাড়া। এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই পাকিস্তানের হাতে চলে যাচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমস জানিয়েছে, ইরান এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল আলী বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এতে খরচ ও সময় দুই-ই বাঁচবে। নতুন রুটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত হলো ৮৮ কিলোমিটারের গদাদর-গাবদ করিডোর। এর মাধ্যমে করাচি থেকে যেখানে সীমান্তে পৌঁছাতে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা লাগতো, এখন গদাদর থেকে মাত্র ২-৩ ঘণ্টায় পণ্য পৌঁছানো সম্ভব, যা পরিবহন খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেবে।

২০২৪ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল ইরানের তেলবহির্ভূত পণ্য রফতানির অন্যতম প্রধান গন্তব্য। ওয়াশিংটনের ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটি’র আর্থিক বিশ্লেষক জিশান শাহ বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার কারণে গত কয়েক দশক ধরে ইরানের বেশিরভাগ তেল ও ট্রানজিট বাণিজ্য দুবাই হয়ে পরিচালিত হতো। কিন্তু এখন ইরান ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে পাকিস্তান সেই জায়গাটি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। পাকিস্তানের সেই অবকাঠামো আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা ইরানের বিশ্বাস রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের কারণে যখন দুবাইয়ের জেবল আলী এবং ইরানের প্রধান বন্দর আব্বাস অচল, তখন এই স্থলপথগুলো পাকিস্তানকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারে।’

ইতোমধ্যে ইরানের চাবাহার ফ্রি জোনের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের গদাদর ও চাবাহার বন্দরের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে পাকিস্তান সফর করেছে। এই রুটগুলো পরবর্তীতে ৭ হাজার ২৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এটি ভারত, ইরান, মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়াকে সংযুক্ত করবে।

ইরানের জন্য বাণিজ্য পথ খুলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো, যখন পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। সমালোচকরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে এই বাণিজ্য সুবিধা দেওয়া মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ’-এর নীতিকে দুর্বল করা। এর মাধ্যমে পাকিস্তান ভূ-রাজনৈতিকভাবে তেহরানের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেও অনেকে মনে করছেন।

তবে ওয়াশিংটন এখনও এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনও আপত্তি জানায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সাংবাদিকরা পাকিস্তানের এই স্থল করিডোর খোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন এবং পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রতি তার সম্মান রয়েছে।

এই করিডোরের মাধ্যমে পাকিস্তান উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরান ও মধ্য এশিয়াকে যুক্তকারী একটি মহাদেশীয় ট্রানজিট রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটি চালান উজবেকিস্তানে পাঠানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে পাকিস্তান যখন উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং রেমিট্যান্স হ্রাসের মুখোমুখি, তখন এই ট্রানজিট বাণিজ্য থেকে আসা কাস্টমস রাজস্ব দেশটির অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙা করবে।

তবে বড় কিছু কাঠামোগত বাধা এখনও রয়ে গেছে। কোনও নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা, লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) এবং বিমা সুবিধা ছাড়া এই করিডোরগুলো স্থায়ী বাণিজ্য রুট হিসেবে গড়ে ওঠা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে পাকিস্তানও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ইরান অবশ্য কেবল পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করছে না। সামুদ্রিক সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে চীন-ইরান রেল করিডোরে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। শিআন থেকে তেহরানের ট্রেন এখন সপ্তাহে একবারের বদলে প্রতি ৩-৪ দিন পরপর ছাড়ছে। তা ছাড়া তুরস্ক, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান এবং কাস্পিয়ান সাগর দিয়েও ইরান পণ্য আমদানি করছে।

ইসলামাবাদের উন্নয়ন নীতি ও ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা জুবায়ের ফয়সাল আব্বাসি বলেন, ‘এই স্থল করিডোরগুলো সাধারণ কার্গো পরিবহনের জন্য উপযুক্ত হলেও বড় আকারের তেল পরিবহনের জন্য উপযুক্ত নয়। কারণ জাহাজের মতো একটি ট্রাকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব নয়।’

তবে জাতিসংঘের তথ্য বলছে, নিষেধাজ্ঞা বা সংকট কেটে যাওয়ার পরও বিকল্প লজিস্টিক সিস্টেমে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীরা হুট করে সেই পথ ত্যাগ করেন না। ফলে হরমুজ প্রণালির সংকট কেটে গেলেও পাকিস্তানের এই জরুরি স্থল করিডোরগুলো টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। জিশান শাহের মতে, ‘যতদিন ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকবে, ততদিন তারা দুবাইয়ে ফিরে না গিয়ে পাকিস্তানের এই রুটগুলোই ব্যবহার করবে।’

সূত্র: আল-মনিটর

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়