মাত্র ৩ মিনিট। খেলোয়াড়রা ঢকঢক করে পানি গিলবেন। এইটুকু সময়েই একেকটি বিজ্ঞাপন বিক্রি হতে পারে ৭০ থেকে ৯০ লাখ ডলারে, যা দেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৪ থেকে ১০৮ কোটি টাকা! অর্থাৎ, খেলোয়াড়দের স্রেফ গলা ভেজানোর এই সুযোগটুকু কাজে লাগিয়েই টিভি চ্যানেলগুলোর পকেটে ঢুকবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
ব্যাপারটা আসলে কী? এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নতুন নিয়ম এনেছে ফিফা। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় হতে যাওয়া ১০৪টি ম্যাচের প্রতি অর্ধে থাকবে ৩ মিনিটের ‘ওয়াটার ব্রেক’ বা পানিপানের বিরতি। গত বছর ক্লাব বিশ্বকাপে গরমে খেলোয়াড়দের নাভিশ্বাস উঠেছিল। এবারও প্রচণ্ড গরম, তাই এমন সিদ্ধান্ত। ফিফা বলছে, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই এই বিরতি। কথা সত্যি। কিন্তু এর আড়ালে আরেকটা খেলা চলছে, সেটা টাকার খেলা!
সমালোচকরা বলছেন, বিশ্বকাপ যেন দিন দিন মার্কিন কায়দার খেলা হয়ে উঠছে। বিজ্ঞাপন আর জাঁকজমকে ঠাসা। আমেরিকার ক্রীড়া সংস্কৃতিতে খেলার মাঝে বিজ্ঞাপন বিরতি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বাস্কেটবল বা রাগবির মতো জনপ্রিয় আসরগুলো এই মডেলেই চলে। এবার বিশ্বকাপেও সেই হাওয়া লেগেছে। ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে পপতারকা শাকিরার হাফটাইম শো যেন আমেরিকানদের সেই বিখ্যাত ‘সুপার বোল’র (আমেরিকান ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর) প্রতিচ্ছবি হতে যাচ্ছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, খেলার মাঝের এই বিরতিগুলো আর্থিকভাবে খুবই লাভজনক। এই অল্প সময়ের বিজ্ঞাপনের জন্য ৭ থেকে ৯ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দাম হাঁকানো হতে পারে! কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে যেখানে প্রায় ১৪২ কোটি দর্শক খেলা দেখেছেন, সেখানে বিজ্ঞাপনদাতারা এই বিশাল দর্শকশ্রোতার মনোযোগ কাড়তে কোটি টাকা ঢালতে পিছপা হবেন না।
আমেরিকানরা খেলার মাঝে এমন বিরতি দেখে অভ্যস্ত হলেও, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের ফুটবল-ভক্তদের কাছে ব্যাপারটা বিরক্তিকর ঠেকতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দর্শকরা ফুটবলের টানা গতির সৌন্দর্য উপভোগ করতেই বেশি ভালোবাসেন। ‘ভিএআর’র কারণে এমনিতেই খেলার গতি নষ্ট হওয়া নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এর ওপর নতুন করে বিজ্ঞাপনের এই বাণিজ্যিক বিরতি তাদের বিরক্তির কারণ হতে পারে। দর্শকদের এই বিরক্তির কথা ভেবেই যুক্তরাজ্যের সম্প্রচারকারী চ্যানেল ‘আইটিভি’ জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই পানি পানের বিরতিতে কোনো বিজ্ঞাপন দেখাবে না।
অবশ্য পানি পানের এই বিরতি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস-মেক্সিকো ম্যাচে প্রথম এমন বিরতি দেওয়া হয়েছিল, যেদিন তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে তখন তা ছিল ম্যাচ বুঝে; এবার সব ম্যাচেই তা বাধ্যতামূলক।
ফিফার চোখ কপালে তোলা আয় : এবারের ৪৮ দলের বিশাল বিশ্বকাপ থেকে ফিফার প্রত্যাশিত আয় প্রায় ৮.৯ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা), যার ৪৪ শতাংশই আসবে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে। পানিপানের এই বিরতি আগামী বিশ্বকাপগুলোতেও স্থায়ী হবে কিনা তা ফিফা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপগুলো স্পেন, মরক্কো ও সৌদি আরবের মতো উষ্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোতে হবে। ফলে ধরেই নেওয়া যায়, এই বিরতি ফুটবলের স্থায়ী অংশই হতে যাচ্ছে।
বাণিজ্যের এই নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব পেতে প্রথাগত টিভি চ্যানেলগুলোর পাশাপাশি অ্যাপল, অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো স্ট্রিমিং জায়ান্টরাও রীতিমতো নিলাম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: যুগান্তর