ভয়াবহ সৌরঝড় থেকে আমাদের এই পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য এক অভিনব পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা পৃথিবীর চারপাশে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ ছিটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সূর্যের বিপজ্জনক চার্জিত কণার তীব্রতা কমিয়ে দিতে সাহায্য করবে। বোস্টন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের একদল গবেষকের তৈরি এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাটি সম্প্রতি স্পেস ওয়েদার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
সৌরঝড় মোকাবিলায় গত কয়েক দশক ধরে মানুষের কৌশল ছিল খুবই সাধারণ, ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া। তবে নতুন এই বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব বলছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মহাকাশের প্রতিকূল আবহাওয়া আঘাত হানার আগেই পৃথিবীর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাকে সক্রিয়ভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম হবে।
কী এই ‘স্টর্মওয়াল’?
বোস্টন ইউনিভার্সিটির ব্রায়ান ওয়ালশের নেতৃত্বে এবং ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের ডি. টি. ওয়েলিং ও জেড. হুয়াংয়ের সমন্বয়ে গঠিত দলটি স্টর্মওয়াল নামের একটি ধারণা উন্মোচন করেছে। এটি মূলত গ্রহ-পর্যায়ের একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা পৃথিবীর চারপাশের অদৃশ্য চৌম্বকীয় ঢালকে আরও শক্তিশালী করবে। কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে তৈরি এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো, তীব্র ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের প্রভাব কমিয়ে আনা, যা স্যাটেলাইট, জিপিএস নেভিগেশন, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং পাওয়ার গ্রিডকে বিকল করে দিতে পারে। গবেষকদের মতে, এই ব্যবস্থা একটি বড় সৌরঝড়ের তীব্রতাকে অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দিতে পারে।
সূর্যের শক্তিশালী বিস্ফোরণের সময় নির্গত চৌম্বক ক্ষেত্র সাময়িকভাবে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় ‘ম্যাগনেটিক রিকানেকশন’। এর ফলে বিশাল পরিমাণ সৌরশক্তি পৃথিবীতে প্রবেশ করে প্রযুক্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। স্টর্মওয়াল মূলত এই প্রক্রিয়াতেই বাধা দেবে।
যেভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি
গবেষকদের প্রস্তাব অনুযায়ী, পৃথিবীর ভূ-সমলয় কক্ষপথে ছয়টি মহাকাশযানের একটি বহর পাঠানো হবে। যখনই কোনও বিপজ্জনক সৌরঝড় শনাক্ত হবে, তখনই এই স্যাটেলাইটগুলো থেকে বেরিলিয়াম, লিথিয়াম, সোডিয়াম বা ক্যালসিয়ামের মতো বিশেষ উপাদান বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হবে। সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসামাত্র এই উপাদানগুলো আয়নিত হয়ে প্লাজমার মেঘ তৈরি করবে।
এই কৃত্রিম প্লাজমা পৃথিবীর চৌম্বক ঢালের সূর্যমুখী প্রান্তে ভেসে যাবে এবং আসন্ন সৌর বায়ু থেকে পৃথিবীকে রক্ষাকারী সীমানাটিকে আরও পুরু করে তুলবে। ওই অঞ্চলে ভর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ম্যাগনেটিক রিকানেকশনের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
পরীক্ষা কি করা হয়েছে?
তত্ত্বটি যাচাই করতে গবেষক দল ২০২৪ সালের মে মাসে ঘটে যাওয়া শক্তিশালী মাদার্স ডে ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের একটি সিমুলেশন তৈরি করেছিলেন। ফলাফলে দেখা গেছে, স্টর্মওয়াল ঝড়টিকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও এর শক্তি ৫০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দিতে সক্ষম।
তবে পুরো প্রস্তাবটি এখনও তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর জন্য বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন। এই মহাকাশযানগুলোকে সম্মিলিতভাবে প্রায় এক ডজন তেলের ট্রাকের সমপরিমাণ রাসায়নিক উপাদান বহন করতে হবে এবং প্রতিবার ছিটানোর পর এটি কেবল একবারই ব্যবহার করা যাবে।
প্রধান গবেষক ব্রায়ান ওয়ালশ এক বিবৃতিতে বলেন, যদি এটি তৈরি এবং মোতায়েন করা যায়, তবে এটি পৃথিবীর সব মানুষকে সাহায্য করবে। আপনি এমনভাবে এটি তৈরি করতে পারবেন না যা কেবল একটি দেশ বা একটি নির্দিষ্ট স্যাটেলাইট গ্রুপকে সাহায্য করবে।
সূত্র: উইয়ন নিউজ